জঙ্গিবাদের সংজ্ঞা

জঙ্গি, জঙ্গিবাদ ও জঙ্গিবাদী শব্দগুলোর মূল হল জঙ্গ। এটি ( ﺟﻨﮓ ـ ﺝ ﻥ ﮒ ) ফার্সী ও উর্দু ভাষার শব্দ। পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত ও প্রসিদ্ধ একটি পত্রিকার নাম দৈনিক জঙ্গ। জঙ্গ অর্থ যুদ্ধ, তুমুল কলহ, লড়াই, প্রচন্ড ঝগড়া। জঙ্গি অর্থ যোদ্ধা। সেভাবে জঙ্গিবাদ অর্থ জঙ্গিদের মতবাদ, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকান্ড। ইংরেজীতে বলা হয় Militant, Militancy কিংবা Military activities. Oxford Advanced Learner’s Dictionary-তে বলা হয়েছে : Militant adj, Favouring the use of force or strong pressure to achieve one’s aim. অর্থাৎ কারো উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য শক্তি প্রয়োগ বা প্রবল চাপ প্রয়োগ। Chamber’s Twentieth Century Dictionary-তে বলা হয়েছে : Militant adj, fighting, engaged in warfare অর্থাৎ সংগ্রামরত বা যুদ্ধরত। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে : using violence, অর্থাৎ সহিংসতা অবলম্বন করা। জঙ্গিবাদ যেহেতু নতুন শব্দ তাই এর আরবী প্রতিশব্দ আরবী অভিধানসমূহে পরিলক্ষিত হয় না। তবে এর কাছাকাছি যে শব্দটির ব্যবহার আমরা দেখতে পাই তা হল ( ﺍﻹﺭﻫﺎﺏ) অর্থাৎ কাউকে ভয় দেখানো, সন্ত্রস্ত করে তোলা, ভীতি প্রদর্শন করা।

পবিত্র আলকুরআনে বলা হয়েছে :

ﻭَﺃَﻋِﺪُّﻭْﺍ ﻟَﻬُﻢْ ﻣَّﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺘُﻢْ ﻣِﻦ ﻗُﻮَّﺓٍ ﻭَﻣِﻦْ ﺭِّﺑَﺎﻁِ ﺍﻟْﺨَﻴْﻞِ ﺗُﺮْﻫِﺒُﻮْﻥَ ﺑِﻪِ ﻋَﺪْﻭَّ ﺍﻟﻠّﻪِ ﻭَﻋَﺪُﻭَّﻛُﻢْ ﻭَﺁﺧَﺮِﻳْﻦَ ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻧِﻬِﻢْ ﻻَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻧَﻬُﻢُ ﺍﻟﻠّﻪُ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻬُﻢْ ـ

‘‘আর তোমরা যতদূর সম্ভব নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য ও পালিত ঘোড়া তাদের সাথে মুকাবিলা করার জন্য প্রস্ত্তত করে রাখ যেন তার সাহায্যে আল্লাহ এবং নিজেদের দুশমনদের আর অন্যান্য এমন সব শত্রুদের ভীত শংকিত করতে পার যাদেরকে তোমরা জান না। কিন্তু আল্লাহ জানেন।’’

পারিভাষিক অর্থে ধর্মীয় কারণে রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে চোরা গোপ্তা হামলা, অতর্কিত আক্রমণ, হত্যা করা, আত্মঘাতী হামলা কিংবা কোন নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জনগণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করাকে জঙ্গিবাদ বলে।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ

পূর্বের অনুচ্ছেদে জঙ্গিবাদের সংজ্ঞা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পার্থক্য তুলে ধরা হচ্ছে। সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ ত্রাস শব্দ হতে উদ্ভূত। এর অর্থ হল ভয়, ভীতি, শংকা। সন্ত্রাস হল আতংকগ্রস্ত করা, অতিশয় ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা। আর সন্ত্রাসবাদ হল, রাজনৈতিক ক্ষমতালাভের জন্য হত্যা, অত্যাচার ইত্যাদি কার্য অনুষ্ঠান নীতি। যার ইংরেজী হল ঞবৎৎড়ৎরংস. এর অর্থ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে :

The systematic use of violance to create a general climate of fear in a population and thereby to bring about a particular political objective.

অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে কোন জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রণালীবদ্ধ সহিংসতার মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা। আরবী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে :

ــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــ

‘‘অর্থাৎ ভয়ভীতি সঞ্চারের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ করা অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে হুমকি প্রদর্শন করা।

‘বিশ্ব মুসলিম সংস্থার’ অধীন ‘ইসলামী ফিক্হ্ কাউন্সিল’ ১৪২২ হিজরীতে পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত ১৬তম অধিবেশনে সন্ত্রাসের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তা হচ্ছে,

ـــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــــ

অর্থাৎ ‘কোন ব্যক্তি, সংগঠন বা রাষ্ট্র কোন মানুষের ধর্ম, বিবেক বুদ্ধি, ধন-সম্পদ ও সম্মান-মর্যাদার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যে শত্রুতার চর্চা করে তাকে সন্ত্রাস বলে।’

উপরোক্ত আলোচনায় আমরা যে জিনিসটি উপলব্ধি করেছি তা হল সাধারণত অন্যায়ভাবে যে কোন ভীতি প্রদর্শন, ক্ষতি-সাধন, হুমকি সৃষ্টি ইত্যাদি অপরাধমূলক আচরণকে সন্ত্রাস বলে, এটা ধর্মীয় কারণে হতে পারে অথবা অন্য কোন কারণে হতে পারে। অন্যদিকে শুধু ধর্মীয় কারণে ন্যায় হোক অন্যায় হোক উপরোল্লিখিত কর্মকান্ডকে জঙ্গিবাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন আমরা লক্ষ্য করেছি কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইসলাম ও মুসলিম নামের সাথে টেরোরিষ্ট্র, ফান্ডামেন্টালিষ্ট, মুসলিম এক্সট্রিমিস্ট ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করে তারা এটাকে ইসলাম ধর্মের সাথে যুক্ত করেছে। তাদের এদেশীয় ও অন্যান্য বিদেশী বন্ধুরা এটাকে জঙ্গিবাদ হিসাবে নামকরণ করেছে। কিছুদিন আগে ভোলা জিলার এক অঞ্চলে ‘‘গ্রীন ক্রিসেন্ট’’ নামের এক ইসলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কিছু অস্ত্র পাওয়াকে কেন্দ্র করে জঙ্গিবাদ নামে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়। একে কেন্দ্র করে ভোলা জিলার অসংখ্য কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়, যদিও কোন একটি মাদ্রাসায় কোন অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অথচ প্রতিনিয়ত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী মেডিকেল কলেজ, সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অস্ত্রব্যবহার, বোমাবাজিসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংগঠিত হচ্ছে। তারা কেউ এটাকে জঙ্গিবাদ বলে আখ্যায়িত করছে না। এগুলোকে জঙ্গিবাদ বলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করছে না। পক্ষান্তরে এর হাজারো ভাগের এক ভাগও যদি কোন ইসলামী প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় তখনই জঙ্গি, জঙ্গিবাদ, জঙ্গিবাদী বলে প্রচন্ড হৈ চৈ শুরু করা হয়। কয়েকদিন পূর্বে বাংলাদেশের প্রভাবশালী আইন মন্ত্রী বলেছেন, ‘এক শ্রেণীর কওমী মাদ্রাসা জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র। ধর্মের নামে সন্ত্রাস রোধ করতে মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কওমি মাদ্রসায় ভাল হওয়ার কোন শিক্ষা না দিয়ে সরাসরি বেহেস্তে যাওয়ার শিক্ষা দেয়া হয়। অন্যের জমি দখল যে খারাপ কাজ এ কথাটি এসব মাদ্রাসায় বলা হয়্ না।’

আইনমন্ত্রী আরো বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান থাকলে ধর্মের নামে সন্ত্রাসের সৃষ্টি হতো না। ৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সংশোধনী এনে বাহাত্তরের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাৎ করা হয়েছে। তারই ফলে দেশে ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে সন্ত্রাস দূর করতে হলে তিনি ধর্মীয় নেতা সহ সবার গঠনমূলক ভূমিকা পালনের আহবান জানান।’ সম্প্রতি এক গোল টেবিল আলোচনা সভায় সাবেক সেনা প্রধান ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম নেতা লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশীদ বলেন, ‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে এদেশের মসজিদগুলোর কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি করা উচিত। মসজিদে কারা আসছে কারা যাচ্ছে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তা করতে হবে।’

উপরোল্লেখিত আইন মন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে আরো কিছু মন্তব্য উল্লেখ করে আমরা বুঝাতে চাচ্ছি যে, কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ইসলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র-সস্ত্র পাওয়া গেলে অথবা এ সকল প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা কোন অস্ত্রবাজি কিংবা হাঙ্গামা বা মারামারি করলে তাকে জঙ্গিবাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাদেরকে জঙ্গি বলে দোষারোপ করা হয়, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা এ সকল কর্মকান্ড করলে তাদেরকে বলা হয় সন্ত্রাসী। এর দ্বারা আরো একটি বিষয় আমাদের নিকট পরিষ্কার হলো, প্রতিটি জঙ্গিবাদকে সন্ত্রাসবাদ বলা যাবে কিন্তু প্রতিটি সন্ত্রাসবাদকে জঙ্গিবাদ বলা যাবে না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s