স্কুল অফ জিহাদ → আবু আনওয়ার আল হিন্দি (পর্ব-৩)[বিষয়: আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল পরিকল্পণা ও তার বাস্তবায়ন]

৯/১১ নিয়ে হামলাকে আল-ক্বা’ইদাহর সমর কৌশলের আলোকে বুঝতে হলে প্রথএম আমাদের বুঝতে হবে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে আল-ক্বা’ইদাহর যুদ্ধের মূল পরিকল্পনা কি ও কিভাবে আল-ক্বা’ইদাহ্* এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে।
অনেকেই ৯/১১ কে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা বা একটি দর্শনীয় হামলা হিসেবে বিবেচনা করতে চান। অনেকেই চান ৯/১১ এর পর আফগানিস্তানে অ্যামেরিকার আক্রমন ও ইমারাতে ইসলামিয়্যার পতনের মধ্যে ৯/১১ এর হামলার সফলতা ব্যার্থতার সমীকরন খুজতে। কিন্তু এধরণের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক না। কারন এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চিত্রের প্রতি মনোযোগ দেয়ার বদলে চিত্রের ক্ষুদ্র একটি অংশে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
৯/১১ কে বুঝতে হলে, ৯/১১ যে যুদ্ধের অংশ সে যুদ্ধের মনোভাবকে বুঝতে হলে আগে আমাদের বুঝতে হবে ৯/১১ এর পূর্বে ক্রুসেডার ও যায়নিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মুসলিম উম্মাহর অবস্থা কি ছিল। আর বাস্তবতা হল উম্মাহ ছিল নিদ্রাচ্ছন্ন। উম্মাহর সামনে এক দীর্ঘ, দুরূহ, ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে যার মত শক্তির মোকাবেলা উম্মাহ এর আগে করে নি। এমন এক শত্রু যে শুধু সামরিক, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতরই না বরং একইসাথে তারা এগিয়ে ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ময়দানে। মিডিয়া, শিক্ষাব্যবস্থা ও দালাল বুদ্ধিজীবি ও আলিমদের মাধ্যমে এ শত্রু নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল মুসলিম উম্মাহর চিন্তার উপর। যুদ্ধে বিজয় তো দূরের কথা উম্মাহ বিজয়ের কথা চিন্তা করতেই ভুলে গিয়েছিল। যুদ্ধে যাওয়া তো দুরের কথা উম্মাহ যুদ্ধ হচ্ছে এটা সম্পর্কেই গাফেল ছিল। শত্রুর মোকাবেলা তো দূরের কথা উম্মাহ শত্রুকে চিনতেই পারছিল না। নিউ ওয়ার্ল্ড ওর্ডারের মায়াজালে আচ্ছন হয়ে উম্মাহ নেশাগ্রস্থের মত টলতে টলতে ঘুরপাক খাচ্ছিল ব্যার্থতা, লাঞ্ছনা আর অপমানের গোলকধাঁধায়।
আল-ক্বা’ইদাহর সামনে ছিল বেশ কিছু অত্যন্ত জটিল সমস্যা।
প্রথমত, উম্মাহকে চেনানো তার প্রকৃত শত্রু কে।
দ্বিতীয়ত, উম্মাহ এ যুদ্ধের বাস্তবতা অনুধাবন করানো
তৃতীয়ত, শত্রু যে অজেয় না তা উম্মাহর সামনে তুলে ধরা
চতুর্থত, উম্মাহকে এ যুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা। উম্মাহর জড়তাকে ভেঙ্গে দেওয়া
পঞ্চমত, অ্যামেরিকার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রন নষ্ট করে দেওয়া
ষষ্ঠত, অ্যামেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি খর্ব করা
সপ্তমত, উম্মাহর বিরুদ্ধে অ্যামেরিকার গোপন যুদ্ধকে প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য করা
অষ্টমত, এমন এক স্থানে অ্যমেরিকাকে যুদ্ধে আঁটকে ফেলা যেখানে কৌশলগতভাবে অ্যামেরিকা হবে দুর্বল
নবমত, উম্মাহর উপর জেঁকে বসা তাওয়াগিতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে যে প্রতিরোঢ চলছিল তাকে একটি কেন্দ্রীয় রূপ দেওয়া
দশমত, মুসলিম বিশ্ব জুড়ে অ্যামেরিকার সাথে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য বাহিনী প্রস্তুত করা
আল-ক্বা’ইদাহ কোন রাষ্ট্র ছিল না, তাদের ছিল না বিশাল ফান্ড, লোকবল কিংবা অস্ত্রভাণ্ডার। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে এ সভ্যতার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা। আর এই যুদ্ধেরও অংশ ৯/১১।
আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল পরিকল্পণা ও তার বাস্তবায়ন
অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হল একের পর এক আক্রমনের মাধ্যমে-
ক) অ্যামেরিকার “অজেয়” রূপ ধ্বংস করে দেওয়া,
খ) অ্যামেরিকাকে মুসলিম বিশ্বে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনা,
গ) অ্যামেরিকার অর্থিনীতিকে রক্তক্ষরণ করানো
ঘ) সারা বিশ্ব জুড়ে অ্যামেরিকান বাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি (social cohesion) ধ্বংস করে দেওয়া।
এ উদ্দেশ্যসমূহ নিয়েই অ্যামেরিকার উপর দারুস সালাম, নাইরোবি, ও গাযওয়াতুল ম্যানহাটনের আক্রমন চালানো হয়।
এর ফলে অ্যামেরিকাকে দুটো ফাদে পা দিতে আকৃষ্ট করা হয়।
প্রথম ফাদটি হল অ্যামেরিকার ঔদ্ধত্য ও প্রতিশোধ স্পৃহাকে ব্যবহার করে তাকে মুসলিম বিশ্বে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। যেটা ছিল আফগানিস্তান আফগানিস্তানে অ্যামেরিকা এমন একটি যুদ্ধে আটকে আছে যেটা সে না গিলতে পারছে না ফেলতে পারছে। সে সম্পুর্ণ ভাবে সর্বাত্বক যুদ্ধে যেতে চাচ্ছে না। কারন অ্যামেরিকার জেনারেল, নীতিনির্ধারকদের চিন্তাভাবনা, দর্শন ও আদর্শের একধরনের খাসী-করন। এরা যুদ্ধেজিততে চায়, কিন্তু যুদ্ধ রক্ত, ধ্বংস আর জীবন দিয়ে যুদ্ধ জয়ের মূল্য তারা দিতে চায় না। তারা চায় দ্রুত বিজয়। তারা চায় ময়দানে নেমে কাপড়ে ময়লা না লাগিয়েই জিতে যাবার। তাই তারা দালাল সেনাবাহিনী, নির্বিচার বিমান ও ড্রোন হামলা ও নিজেদের স্বল্প সংখ্যক সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে সিমিত পরিসরের যুদ্ধের মাধ্যমে এ যুদ্ধে বিজয়ী হতে চায়।
কিন্তু এ সীমিত পরিসরের যুদ্ধ দিয়ে (যেটা তারা বর্তমানে করছে, ড্রোন, কাফগানিস্তানে বেইস, দশ/বিশ হাজার সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে) তারা জিততে পারছে না।
অ্যামেরিকা নিজের জন্য পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে ইরাক আক্রমন করে ও সেখানে হেরে। এখন চাইলেও তারা সরাসসি ইরাক বা সিরিয়াতে ঢুকতে পারছে না। অর্থাৎ অ্যামেরিকার মূল ভূখন্ড অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার নীতির অক্ষমতা এক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে। অথচ এক সময় মুসলিম উম্মাহ মনে করতো অ্যামেরিকা চাইলে পৃথিবীর যেকোন জায়গা দখল করে নিতে পারে, নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিতে পারে। আজো অনেকে এমন মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা হল অ্যামেরিকার ক্ষমতার মায়াজাল আফগানিস্তান, ইরাক ও শামে ভেঙ্গে গেছে।
এ আগ্রাসনগূলোর কারনে অ্যামেরিকা প্রথমত বিশ্বব্যাপী জিহাদী তানযীমগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেছে।
দ্বিতীয় ফাদটির জন্য আবশ্যক হল, অ্যামারিকাকে ও ইস্রাইলকে ক্রমাগত সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন ভাবে আক্রমনের নিশানা বানানো। গাযাওয়াতুল ম্যানহাটনের অগ্রবর্তী দলের মতো হাজারটি দল যদি অ্যামেরিকাকে তার দেশের ভেতরে (আব্দুল হাকিম মুহাম্মাদ, ফোর্ট হুড, বস্টন, চ্যাটানুগা, স্যান বার্নাডিনো) এবং দেশের বাইরে (০২ তে করাচিতে অ্যামেরিকান কন্সুলেটে হামলা, রিয়াদ ও জেদ্দা বম্বিং, ০৮ এ ইয়েমেনে অ্যাম্বেসিতে হামলা, মুম্বাই অ্যাটাক, বেনগাজি) হামলার শিকার বানায় তবে অ্যামেরিকা কোন একটি দেশ পাবে না যাকে সে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারবে, আর না সে পারবে এক সাথে সবগুলো দেশে আক্রমন করতে। বরং অ্যামেরিকা এই উপসংহারে আসবে যে এ শত্রু এক অশরীরী ন্যায় যে একই সাথে একাধিক স্থানে অবস্থান করে, কোন নির্দিষ্ট একটি স্থানে এ শত্রু ঘাটি গেড়ে বসে থাকে না, ফলে এসব দেশের সরকারগুলো তাকে নিরাপ্ততা দিতে সক্ষম না।
যখন অ্যামেরিকা অনুধাবন করবে মুসলিম বিশ্বের তাওয়াগীত শাসকগোষ্ঠী তাঁকে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম না। তখন সে দুটো কাজের যেকোনে একটি করতে বাধ্য হবে।
১) হয় সে নিজে সরাসরি সামরিকভাবে ঐ সব দেশে প্রবেশ করবে
২) অথবা অ্যামেরিকা ঐসব দেশ থেকে তার স্বার্থ গুটিয়ে বের হয়ে যাবার চেষ্টা করবে। এবং ঐসব দেশের এজেন্ট শাসকদের প্রতি তার সমর্থন সরিয়ে নেবে, যেহেতু এখন এসব শাসকদের পক্ষ থেকে তার পাবার আর কিছু নেই।
যদি অ্যামেরিকা ১ নম্বর অপশন বেছে নেয়। তবে তার এ সিদ্ধান্ত এসব অঞ্চলে উপস্থিত তার সেনা ও তার কর্মকর্তাদের সাথে এসব দেশের জনগণের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেবে। যদি নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে অ্যামেরিকা কোন অঞ্চলে আসে। অর্থাৎ সামরিকভাবে কোন অঞ্চলে যদি অ্যামেরিকার আগমন ঘটে, তবে শুধুমাত্র অ্যামেরিকার উপস্থিতিই সে অঞ্চলের মুসলিম যুবকদের মধ্যে, তাদের রক্তে আন্দোলনের সৃষ্টি করে।
হাজার হাজার মুসলিম যুবককে তখন আর কিছু বোঝাতে হবে না। তারা নিজের চোখেই দেখবে অ্যামেরিকা তাদের শত্রু, অ্যামেরিকা আগ্রাসনকারী। একই সাথে যদি অ্যামেরিকা সামরিক ভাবে আগমন করে তবে তা মুজাহিদিনের সুবিধা ও অ্যামেরিকার অসুবিধাকে জ্যামিতি হারে বাড়িয়ে দেবে। কারন যে দশটি পয়েন্ট ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, অ্যামেরিকার সামরিক উপস্থিতি প্রতিটির ক্ষেত্রেই মুজাহিদিনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে, এবং প্রতিটির ক্ষেত্রেই অ্যামেরিকার জন্য সমস্যা বৃদ্ধি করবে।
আর যদি অ্যমেরিকা ২ নম্বর অপশন বেছে নেয় তবে মুজাহিদিনের মূল উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি অর্জিত হবে। যা হল মুসলিম বিশ্বের তাওয়াগিতের প্রতি অ্যামেরিকার সমর্থন ও মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার হস্তক্ষেপ।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s